Press "Enter" to skip to content

ধূসর রঙের স্মৃতি

০১. শৈশবে ভেবেছি আমি লেখক হবো। বাঁধাই করা খাতা দেখলেই, পাণ্ডুলিপি বানানো যাবে এই ভেবে রেখে দিতে চাইতাম। পরে মাথায় এলো চিত্রশিল্পী হতেতো আমার কোন অসুবিধা নেই। আমার সমবয়সীদের মধ্যে আমিই আঁকি ভালো । আমার চেয়ে কেউই ভালো আঁকতে জানেনা । এস.এস.সি পরিক্ষা শেষে নেত্রকোণা থেকে ফেরার সময় পান্ডা মার্কা একটি রংএর বাক্স কিনে নিয়ে এলাম। দাম ৪৫ টাকা। কতযে খরচ বাঁচিয়ে রংএর বাক্সটা কিনেছিলাম তা আজো মনে হলে কষ্ট হয়। সুখ পাই যখন চকচকে রংএর বাক্সটার ভেতরে অনেক রংয়ের সমাহার, পাশে একটা তুলির কথা মনে হয়। আমার জীবনে এ তুলিটাই প্রথম ব্যবহার করেছিলাম। পরিক্ষার ফলাফল প্রকাশের ফাঁকে সময় আছে তিন মাস। সে সময় রংতুলিতে ছবি আঁকা, অক্ষর তৈরির চেষ্টা করবো। স্কুলের পরিক্ষার জন্য জীবনের লক্ষ্য রচনা লিখতে শিখেছিলাম, আমি ডাক্তার হবো। কলা বিভাগের ছাত্র যে ডাক্তারী পড়তে পারেনা তাতো জানতামনা। আমাদের শিক্ষকর্ওা কি জানতেন না? কেন সে রচনা পড়তে বলতেন? সে চিন্তা করে আজো এর কোন উত্তর পাইনা। তবে হা হরলাল রায়ের রচনার বইয়ে যা আছে তাই শিখেছি। ভেতরে ভেতরে আমি চিত্রশিল্পী হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

কেমন যেন নেশায় ডুবে গেলাম রংতুলি নিয়ে। এ নেশা আমাকে ক্রমে পড়ালেখা থেকে দূরে ঠেলে সরাচ্ছে। আমি শিল্পী হবোই এমন নেশা আমাকে পেয়ে বসলো। এর মধ্যে নেত্রকোণার এক শিল্পী মঞ্জুরুল হক এর আকাঁ সাইনবোর্ড আমাকে আকৃষ্ট করতে শুরু করে। অপূর্ব রংএর ব্যবহার। পরিকল্পিত তুলির আঁচড়। আমি মনে মনে তাঁর শিষ্যত্ব বরণ করে নিলাম। কয়েকদিন তাঁর কাছে হাতেকলমে তুলির ব্যবহার শিখে ছিলাম। লেখাপড়ায় মনোযোগ হ্রাস পাওয়ায় বাবা-মা আশাহত হচ্ছেন। ফলাফল ভালো না। এক সময় কলেজে উঠলাম। আমার নিচের ক্লাসে যারা পড়তো তারা আমার ক্লাসমেড হয়ে গেলো। সে কারণে ক্লাসের অনেকের সাথে মিশতে পারতামনা। একটু দূরেদূরে থাকতাম। নিজেকে স্বতন্ত্র করে নিলাম। কলেজের প্রথম বর্ষ থেকেই আমি থানা শহরের স্থানীয় পত্রিকার সাংবাদিক, পাশাপাশি চিত্রশিল্পী। বেশ নামডাক। থানার বড়কর্তা আমার নামের শেষে সাহেব যুক্ত করে ডাকেন। আমার ক্লাসমেডরা এরকম কান্ডকারবার দেখে ফেলফেলিয়ে চেয়ে থাকে। আমি খুব মজা পাই। তারাও গর্ব করে বলেÑ আমাদের ক্লাসে একজন সাংবাদিক পড়ে। প্রিন্সিপাল কলেজের মাঠ উন্নয়ন সহ নানা কাজ আমাকে দিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রকল্প আদায় করিয়ে আনেন। এতে আমার অহংকার আরো বেড়ে যায়। আমি অন্য দশজন ছাত্রের মত নই। আমি অন্যরকম।

আচই.এস.সি পাশ করে আর্ট কলেজে ভর্তি হবো। তা আর হয়নি। বাবার এক মাত্র ছেলে বলে কথা। নানা স্থান থেকে নানা জনের উৎপাত ভাল মেয়ে আছে। ১৯৮৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর। মা-বাবার পীড়াপীড়ীতে আমাকে বিয়ে করতে হলো। বিয়ে করতে হলো স্কুল জীবনের এক ব›ন্ধুর শালীকে। আমারোতো পছন্দ বলে একটা কথা ছিল? সে সুযোগতো সে সময় অন্যায় বলে গন্য হতো। বিয়ে করেছি ঠিকই কিন্তু আমার মনেই হয়নি আমি বিয়ে করেছি। আমার কাছে মনে হয়েছিল, এ যেন এক পারিবারিক অনুষ্ঠানিকতা মাত্র। পুতুল খেলা বলবোনা কেননা শৈশববে কখনো পুতুল নিয়ে আমি খেলিনি।
এই এক বিয়েই আমার শিল্পী হওয়ার নেশা যে কোথায় গেলো তা আজো আমি খুঁজে পেলামনা। লেখক হওয়ার বাসনাটা কিভাবে থেকে গেলো তা একটু পরে বলছি। তবে যে মানুষটি আমাকে লেখক সত্বাকে ঠিকিয়ে রেখেছেন, তিনি যদি চিত্রশিল্পী হতেন তবে আমিও তাই হতাম, তাতে কোন সন্দেহ আমার নেই।

০২. এরশাদ সরকার ক্ষমতায় বসলো। থানা আর থানা রইলোনা উপজেলা হয়ে গেলো। রাতারাতি সেখানকার জায়গাজমির দাম বাড়তে শুরু করলো। উপজেলা সদরে শহরের বাতাস বইছে। নানা বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে মফস্বল শহরের সংবাদিকদের কদর বেড়ে গেছে। এ যেন রাতারাতি শুধু পরিবর্তনের হাওয়া। অনেক কর্মকর্তার সঙ্গে উঠা-বসা। অপেক্ষাকৃত কমবয়সী কর্মকর্তাদের সঙ্গে সহজ আচরণ হতো আমার। সেটা হয়তো বয়সের কারণে। একটু বয়স্ক কর্মকর্তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখতাম। সমীহ করে চলতাম। পেছনে আবার কেউ ইচড়েপাকা না বলে। পরিবারের সুনাম ক্ষুন্ন হয় সে দিকেও খেয়াল রাখতাম।
সমবায় কর্মকর্তা তুষ্টচরণ বাগচী। একটু বয়স্ক মানুষ। উপজেলার কমপ্লেক্স মাঝামাঝি একটি কক্ষে তাঁর অফিস। সেদিকে যেতাম না। এড়িয়ে চলতাম। কিন্তু তাঁর কাব্য প্রতিভা ও রসবোধ আমার মত অপেক্ষাকৃত কম বয়সী কর্মকর্তদেরও কাছে টানতো। কম বয়সী ডেন্টাল সার্জন হিমাংশু বিমল রায় অনেক সময় আমাকে নিয়ে তুষ্টচরণ বাগচীর অফিসে যেতেন। আমার কানে আজো শুনতে পাই সেই সমবায় কর্মকর্তার প্যারডি কবিতার আবৃত্তি। ক্রমে আমাদের বয়সে দূরত্ব কমতে শুরু করলো। পিতা-পুত্রের যেমন বন্ধুত্ব হয়, বয়সের ব্যবধান থাকেনা, এক সময় তেমনি হয়ে গেল।। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন তুষ্ট বাবুর পরিবার পরিজন রেখেছিলেন নিজ বাড়ি মাদারীপুরে। ডরমেটরীর একটি কক্ষে অন্যান্য অফিসারদের সঙ্গে থাকতেন তিনি। ডরমেটরীতে অফিসারদের আড্ডা আর তাসখেলা হতো নিয়মিত। তা জানতাম তাই কখনো ডরমেটরীর দিকে যেতাম না।

০৩. ১৯৯১ সালের সম্ভবত জানুয়ারি মাস। সকালের দিকে বাবু তুষ্টচরণ বাগচী তাঁর ছেলেকে নিয়ে আমাদের সততা ফার্মেসীতে আসলেন। এইচ.এস.সি পাশ করে বাবার কর্মস্থলে বেড়াতে এসছেন তাঁর ছেলে তপন বাগচী। সম্ভবত পরিবেশগত কারণেই ছেলেকে ডরমেটরীর বাইরে রাখতে চেয়েছিলেন। তাঁর ছেলে তপন বাগচীকে দেখিয়ে আমাকে বললেন আপনাদের লোক। অবশ্য অল্পক্ষণের মধ্যেই জানালেন তার ছেলে এবার এইচ.এস.সি পাশ করেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির চেষ্টা করছে। ফাঁকে নতুন জায়গায় বেড়াতে এসেছে। তাঁর চেয়েও বড় পরিচয় পেলাম তাপন বাগচী কবিতা লেখেন। অবশ্য এর আগেই একদিন কথায় কথায় তুষ্টচরণ বাগচী ডেন্টাল সার্জন হিমাংশু বাবুকে আজকের কাগজের পৃষ্টায় একটি কবিতা দেখিয়ে বলে ছিলেন আমার ছেলের কবিতা। আমি সেদিন অবাক হয়েছিলাম। তুষ্টবাবুর ছেলে কবি? কবিদের বরাবরই আমি ভয় পাই। কারণ কবিতা লিখতে হলে ভাষা জানতে হয়। শুধু ভাষা নয় ভাষার ভেতরের বিষয় আসয় অনেক কিছুই; না হয় কবিতা লিখা যায়না। আমিতো মফস্বলের সাংবাদিক ভাষাজ্ঞান থাকলেই আমার কত আছে। তাও মফস্বল কলেজের বি.এ ক্লাশের ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয় হলে কথা ছিল।
সেই কবি তপন বাগচী কিনা এখন আমাদের সঙ্গী করতে তাঁর বাবা নিয়ে এসছে। আমার সঙ্গে তার বয়সের ব্যবধান তেমন নয়। আমি বড়জোর তিন বছরের বড় হতে পারি। তবে মনের দিকে সমান। দিপক, শাহীন, চন্দন, খোকন এরাওতো আমার ছোট। কিন্তু আড্ডা দেই এক সাথে। চলি এক সাথে। মনের মিল আছে বলেই সম্ভব হচ্ছে।

তপন বাগচীকে পেয়ে আমি খুব খুশি হয়েছিলাম। ফেব্র“য়ারিতে উত্তর আকাশের একটি সংখ্যা বের করবো। দিপক, শাহীন আমি পরামর্শ করছি বারবার। কি ভাবে লেখা জোগাড় করবো। টাকা জোগাড় করবো। কোথায় ছাপতে দেবো। যেখানেই ছাপতে দেইনাকেন এবার কভার অফসেট প্রেসেই ছাপতে হবে। না হয় মান-সম্মান থাকবেনা। তখনো ময়মনসিংহে অফসেট প্রেস আসেনি।

আমাদের সঙ্গী হলেন তপন বাগচী। ফকিরের চায়ের দোকানে বসে চায়ের ফাঁকে পরামর্শ করি। দুপুর হলে ডরমেটরীতে চলে যান তপন। বিকেলে আবার আসেন। এমনি ভাবেই কয়েকদিন কেটে ছিল আমাদের। হঠাৎ তপনের দেখা নেই। কোথায় গেলো তপন বাগচী? বাবাকে জিঙ্গেস করে জানলাম ভর্তি পরিক্ষা দিতে চলে গেছে। একদিন ফকিরের চায়ের দোকানে বসেই আমার হাতে একটি ছড়া দিয়েছিলেন তপন বাগচী। আজো ছড়িিটর নাম আমার মনে আছেÑ‘পেশা’। ইতোমধ্যে বাবা তুষ্টচরণ বাগচী বদলী হয়ে চলে গেছেন। তবে মাঝেমধ্যেই আজকের কাগজ সহ নানা পত্র-পত্রিকায় তপনের কবিতা, ছড়া দেখি। সাময়িকপত্রের উপর বই খুঁজতে যেয়ে দেখি তৃণমূল সাংবাদিকতার উপর তপন বাগচীর চমৎকার একটি বই। মনে আছে একুশের মেলায় পাঠক সমাবেশ থেকে বইটি কিনে ছিলাম। অনেক বড়মাপের গবেষক তপন বাগচী? তাতো জানতামনা। বলেরাখা প্রয়োজন সে বইটি আমাকে ‘ময়মনসিংহের সাময়িকী ও সংবাদপত্র’ বইটি লেখার অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল।

অনেক দিন দেখা নেই তপন বাগচীর সঙ্গে। তাঁর কি মনে আছে আমাদের কথা। ফকিরের চায়ের দোকানের আড্ডার কথা। হয়তো আছে। হয়তো নেই। মনে না থাকারইতো স্বাভাবিক।

০৪. কেন মনে থাকবে এত দিন। এত দিন মানে কয়েক বছর দেখা নেই তপন বাগচীর সঙ্গে। আমি দেখলে কি তাকে চিনতে পারবো। মনে তেমন ভরসা ছিলনা। একুশের মেলায় কবি আসলাম সানি কি কারণে তপন বাগচীকে নাম ধরে ডাকছেন। আর আমি তপনের এখন স্বাস্থ্য, চেহারাটা কেমন তা দেখতে তাকিয়ে আছি। বিষয়টা ছিল কাকতালিয়। দেখলাম কিন্তু একানব্বইয়ের তপন বাগচীর সঙ্গে মিলাতে পারলাম না। সম্ভবত সেও আমাকে চিনতে পারবেনা। সুতরাং পরিচয় না দেয়াই ভালো।
১৯৯৯ কিংবা ২০০০ সালে বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট এ গিয়েছিলাম। কি কারণে তা আজ মনে নেই। দ্বিতীয় তলায় জনৈক মহিলার টেবিলের সামনে বসে আছি। অফিসের লোক জনের কথায় জানতে পেলাম উপরের তলায় পরিচালকের কক্ষে বসে আছেন তপন বাগচী। সাহস করে মহিলাকে বললাম তপন বাগচীর সঙ্গে কি কথা বলা যাবে? তিনি বললেন কেন যাবেনা? কী কথা? বললাম ব্যক্তিগত। মহিলা উপরের তলায় ফোন করে তপন বাবুকে বললেন আইয়োব নাম এক ব্যক্তি আপনার সঙ্গে কথা বলতে আমার এখানে অপেক্ষা করছেন। আমাদের বসতে বলে তিনি যেন দৌড়ে বেড়িয়ে আসলেন। দুহাত মেলে জাবড়ে ধরলেন। আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম চিনতে পেরেছেন কি না। উত্তর দিলেন কেন নয়। আইয়োব ভাই আপনি কি ভুলার মানুষ। আপনাকে কত খোঁজ করি। কোথাও পাইনা। সব মনে আছে, কিছুই ভুলিনি। এক দমে কথাগুলো বলে শেষ করলেন তিনি। সে দিন আমার সঙ্গে শাহীন ছিল। তপন বাবু শাহীনকেও চিনতে অসুবিধে হয়নি। প্রখর মেধার মানুষ, ভুলেননি কিছুই। এত দিন যে একটা ভুলের মধ্যে ছিলাম। যদি না চিনেন তিনি। অল্পক্ষণেই তা ভুলে পরিনত হলো। আমাদের নিয়ে গেলেন তাঁর কক্ষে। মনে আছে সে দিন দুপুরে আমরা তিন জন এক সঙ্গে দুপুরের খাবার খেয়েছিলাম। খেতে খেতে কথা হচ্ছিল। সে কথায় কোন নির্ধারিত বিষয় ছিলনা। একথা থেকে সেকথা। সব এলোমেলো। যেন হাজার বছর বললেও শেষ হবেনা কথার। কতকাল পরে হারিয়ে যাওয়া আপনজনকে কাছে পেলে যেমন হয়।

০৫. ঢাকায় তপনদার অফিস আমার একটি ঠিকানা। তিনি চাকরী পরিবর্তন করেছেন পিআইবি থেকে নানা বেসরকারি সংস্থা, পত্রিকা, শেষে বাংলা একাডেমি। এর পরেও আমার ঠিকানার পরিবর্তন হয়নি। আজো তপনদা যেখানে বসেন সেটাই আমার ঠিকানায় পরিনত হয়।
পিআইবিতে থাকা অবস্থায় আমার নেত্রকোণা জেলার ইতিহাস নিয়ে একদিন কথা হয়। এ বইটি সম্পর্কে আমার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগেই তিনি জেনেছিলেন। এখন কী লিখেছি? এসব বিষয়াদি নিয়ে কথা হয়। আমি গারো পাহাড় অঞ্চলের আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করছি যেনে তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন। সেখানকার ছয়টি আদিবাসীর মধ্যে গারো, হাজংদের কথা সবাই জানলেও অন্যান্যদের কথা কেউ খোঁজ রাখেন না তেমন। গারোদের উপর গবেষণা হলেও তখন পর্যন্ত হাজংদের উপরও কোন কাজ হয়নি। তপনদা আমাকে পরমর্শ দিলেন হাজংদের অংশটা গ্রন্থাকারে বের করেদেন। আমার মাথায় তখন পর্যন্ত এরকম চিন্তা ছিলনা। কথাটা শুনামাত্রই মনে হলো তাইতো! আমি বসে আছি কেন। বাড়ি এসে পরের মাসেই হাজংদের অংশটার পাণ্ডুলিপি নিয়ে ঢাকায় গেলাম। সনটা ছিল ২০০৪ সালের মে মাস। মনে তখন প্রবল সাহস। এ লাইনে ঢাকায় আমার লোক আছে। কোন চিন্তার কারণ নেই। পি.আই.বিতে তপনদাকে পাণ্ডুলিপি দেখালাম। তপনদার বারণ সত্বেও বাংলা একাডেমিতে পাণ্ডুলিপিটি জমা দিতে গেলাম। সে আর এককাণ্ড। পরে একদির বলবো।

বাংলা একাডেমিতে আমার পাণ্ডলিপি ভূতে পেয়েছিল। তপনদার এক বন্ধুর ঝাড়ফুঁকে সে ভূতের আচর থেকে সেবার রক্ষা পেয়েছিল আমার পাণ্ডুলিপিটি। তপনদার সহায়তায় সে পাণ্ডুলিপি বাংলাবাজারের সূচীপত্র প্রকাশনী থেকে ‘বাংলাদেশের হাজং সম্প্রদায়’ নামে বেরিয়ে ছিল। বাঁচা গেল। আঁতুড় ঘরেই মারা পড়েছিলাম।

সে সময় তিনি আমাদের সময় পত্রিকায় কাজ করেন। আমি যেমন রাতারাতি বড় লেখক বনে গিয়েছিলাম। আমার সঙ্গে গৌরীপুরের রঞ্জিত করও রাতারাতি লেখক হয়েছিলেন। তপনদার অনুরোধে সূচীপত্র প্রকাশনী রঞ্জিত করের ‘সনাতন ধর্ম মত ও মতান্তর’ পাণ্ডুলিপিটি ২০০৫ সালের একুশের মেলায় গ্রন্থাকারে বেরিয়েছিল। আমরা এখন না বুঝলেও, রঞ্জিত বাবু কিন্তু এ সময়ের বড় লেখক।

ইতোমধ্যে তপনদা বললেন ‘আপনার নেত্রকোণা জেলার ইতিহাসটিতো ব্যক্তি উদ্যোগে বেরিয়েছিল; এটি যদি ঢাকার কোন প্রকাশনা সংস্থা থেকে বেরতো তবে এর প্রচারটা বেশি হতো।’ তাইতো আমাদেরতো নিজ জেলা সহ আসপাশে জেলা ছাড়া অন্যকোন জেলায় পৌছানোর কোন সুযোগ নেই। ঢাকার প্রকাশনা সংস্থাগুলোর সে ক্ষমতা ও সুযোগ দুটাই আছে। দেশের সবখানেই বই বিক্রি তাদের কাজ । তাঁর মুখ থেকেই প্রস্তাব পেলাম বাংলাবাজারের গতিধারা আপনার নেত্রকোণা জেলার ইতিহাস বের করবে। আমি এককথায় রাজি। একটু পরিমার্জন করে পাণ্ডুলিপি পঠিয়ে দিলাম। যথারীতি আমার নেত্রকোণা জেলার ইতিহাস গতিধারা থেকে বেরিয়ে গেলো। রাতারাতি আমি হিরু।

ইতোমধ্যে গারো পাহাড় অঞ্চলের ছয়টি আদিবাসী নিয়ে আমার গবেষণা কাজ শেষ করে ঢাকায় গিয়ে তপনদার হাতে পৌছে দিয়ে আসি। আমি নিশ্চিন্ত আগামী মেলায় আমার বই বেরোবে।

তিনি প্রকাশনা সংস্থা পরিবর্তন করে শোভা প্রকাশকে ‘গারো পাহাড় অঞ্চলের আদিবাসী’ গ্রন্থের পাণ্ডুলিপিটি দিলেন। সেটিও যথারীতি বেরিয়ে গেলো। এর মধ্যে তপনদার পরামর্শে নেত্রকোণার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করতে শুরু করি। সেই পেশাদার গবেষকের পরামর্শে আমিও পেশাদারিত্বের দায়িত্ব নিয়ে ‘নেত্রকোণা জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ প্রণয়ন করি। সে গ্রন্থটিও বের করেছিল গতিধারা থেকে। গতিধার আমার আর একটি গ্রন্থ বের করেছিল কেদারনাথের সাহিত্য কর্মের উপর। অবশ্য সে গ্রন্থটির আমি নামকরণ করেছিলাম ‘কেদারনাথ মজুমদার: জীবন ও সাহিত্য’। তপনদা সে নামটি পরিবর্তন করে এর নাম দিয়েছিলেন ‘ময়মনসিংহের ঐতিহাসিক ‘চিত্র’ ও কেদারনাথ মজুমদার’। এ নামটি যথার্থ বলে পরে আমার মনে হয়েছে। গারোদের ধর্ম নিয়ে যখন আমি কাজ শুরু করি, তখন আমি অনেকটা ভয়ে ভয়ে ছিলাম। তপনবাবুর প্রেরণা যে আমাকে দিয়ে কি করাতে পারে তা যদি কেউ ‘গারো স¤প্রদায়: ধর্মের উৎস ও প্রভাব’ গ্রন্থটি পড়েন তবে তা অনুমান করতে পারবেন। এভাবেই একএক করে তপনদা আমাকে দিয়ে আটটি গ্রন্থ প্রণয়ন করিয়েছেন। এখানে আমার কৃতিত্ব বলতে শিখিয়ে দেয়া কলা কৌশলে শ্রম দিয়েছি শুধু মাত্র। প্রয়োজনীয় গ্রন্থ সরবরাহ থেকে শুরু করে প্রকাশনার ব্যবস্থা সহ বাকী সবই তপন বাগচীর কৃতিত্ব।

০৬. তপন বাগচী আমার পরিবারের সদস্যদের একজন। আমার ছেলে মেয়েরা তাঁকে কাকা বলেই মনে করে। আমার বাড়িতে তিনি দুবার গিয়েছেন। আমার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে লক্ষ্য করেছি তপন বাগচী আসছে, মানে পরিবারের কোন সদস্য এতদিন বাইরে ছিল, আজ বাড়ি ফিরছে। এ অনুভূতিটি আমি অনুভব করি। পরিবারের সদস্যদের মুখাবয়ব তাই বলে। সেটা পরিবারের কাছ থেকে আমারও পাওনা বলে আমি মনে করি।

তপন বাগচী সম্পর্কে আমার অভিব্যক্তি হলো, নিরহংকারী এ লোকটি মানুষকে সহজে বিশ্বাস করেন। সহযোগিতা করতে ভালোবাসেন। অন্যের কাজটিকে নিজের বলে মনে করেন। আমি আমার দীর্ঘ সময়ে যা দেখেছি তিনি মফস্বলের কোন লেখক আসলে তাকে সহায়তা করেন। তিনি যেন তার অপেক্ষায়ই বসে ছিলেন। দেশের প্রতিথযশা অনেক লেখক সে কারণে তারপ্রতি বিরক্ত হতেও আমি দেখেছি । উপকারভোগী লেখককে অকৃতজ্ঞের মত কথা বলতেও শুনেছি। এর পরেও যেন এ মানুষটি অন্যকে সহায়তা দিয়ে আনন্দ পান।

অখ্যাত গ্রামের আমার মত মানুষকে লেখক বানিয়ে প্রখ্যাত করতে তাঁর প্রাণপণ প্রচেষ্টার কোন ত্র“টি আমি দেখিনি। কেন? এর উত্তর হয়তোবা তিনিও দিতে পারবেন না। আমার কাছে সাদামাটা একটা উত্তর আছেÑ ‘এ মানুষটির হয়তো মানুষের কল্যাণের জন্যই জন্ম হয়েছেন।’ আমার প্রযোজনে তাঁর সক্ষম দীর্ঘ জীবন কামনা করি। কেননা আমি যে দিন থাকবোনা, সে দিন আমার সম্পর্কে তিনিই ভালো লিখতে পারবেন। অন্য কেউ আমার লেখালেখি সম্পর্কে তাঁর চেয়ে বেশি জানেন বলে আমি জানিনা।

আলী আহাম্মদ খান আইয়োব
লেখক ও গবেষক

More from বিনোদনMore posts in বিনোদন »
More from লাইফস্টাইলMore posts in লাইফস্টাইল »

Be Fir to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *