Press "Enter" to skip to content

Posts published in “সাহিত্য সাময়িকী”

স্মৃতির সব রঙ ধূসর-২

এক.
কুড়ি শতকের নব্বই দশক পর্যন্ত শ্যামগঞ্জের সঙ্গে তার উত্তারাঞ্চলের যোগাযোগ ভাল ছিলনা। এ পথের যাত্রীরা বেশির ভাগই ট্রেনের অপেক্ষায় থাকতো। রাতে দিনে তিনবার ট্রেন চলতো। এক সময়ের ট্রেন ধরতে না পারলে ৬ থেকে ৭ ঘন্টার ফেরে পড়ে বসে থাকতে হতো। এর বিকল্প ছিল পায়ে হাটা। শ্যামগঞ্জ থেকে পূর্বধলা হয়ে সুসঙ্গ দুর্গাপুরের বাস চলাচল শুরু হয় নব্বই দশকের শেষের দিকে। এর আগে এ পথে চলতো গরুর গাড়ী । মাঝে মাঝে খ্রিস্টান মিশনারীরা এ পথে মোটর সাইকেলে যাতায়াত করতো। যোগাযোগের কারণে পূর্বধলা থেকে শ্যামগঞ্জ বাজারটি অনেক দূরের পথ বলে মনে হতো।
অনেক পুরনো বাজার শ্যামগঞ্জ। কথিত আছে মৈমনসিংহ পরগনার জমিদার শ্যামচাঁদ (জন্ম: ?-মৃত্যু: ১৮১০ খ্রি:) এর নামে এ বাজারটির নামকরণ হয়েছিল। তার ছেলে শম্ভুচন্দ্রের (জন্ম: ?- মৃত্যু: ১২৬০বঙ্গাব্দ) নামানুসারে শম্ভুগঞ্জ বাজারটি প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। কেউ কেউ বলেন পূর্বে শ্যামগঞ্জ বাজারটি বড়দার হাট নামে খ্যাত ছিল। শ্যামগঞ্জ বাজারটি প্রাচীন হিসেবে এর ঐতিহ্য রয়েছে। রেল জংশন হিসেবে এর গুরুত্বও আছে।
পূর্বধলা, দুর্গাপুরের লোকজন নেত্রকোণা শহরে যাতায়াতের জন্য সকালের ট্রেনটি একমাত্র অবলম্ভন ছিল। সকালের ট্রেনে শ্যামগঞ্জ রেল স্টেশনে যেয়ে, দুপুরের মোহনগঞ্জ গামী ট্রেনের অপেক্ষা করতে হতো। সে কারণেই শ্যামগঞ্জ বাজারের অনেকের সঙ্গে পূর্বধলা অঞ্চলের অনেকের বাড়তি সম্পর্ক গড়ে ওঠে ছিল। শ্যামগঞ্জ বাজারটি মিশ্র সাংস্কৃতিক সত্ত¡া নিয়ে গড়ে ওঠা। গৌরীপুর, ফুলপুর ও পূর্বধলা থানার সীমান্তবর্তী অবস্থানই হয়তবা এর মূল কারণ।
শ্যামগঞ্জ কেন্দ্রিক সাহিত্য, সাংবাদিকতা তথা সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ সিদরাতুল মুন্তাহা ও মিজানুর রহমান বাবুর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। সম্ভবত সে পরিচয়টির সূত্রপাত হয়েছিল সত্তরের দশকে। সমমনা মানুষ হওয়ায় হয়তবা সে সম্পর্ক গড়ে ওঠেছিল। সেখানে বয়স আমাদের সম্পর্কের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় নি। সিদরাতুল মুন্তাহা আজ আর আমাদের মাঝে নেই। মিজানুর রহমান বাবু জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে শ্যামগঞ্জ থেকে স্থানান্তর হয়েছেন অনেক আগেই। তার সঙ্গেও এখন আর যোগাযোগ নেই।

দুই.
বাংলার দর্পন সাপ্তাহিকটি ছিল তৎকালীন বৃহত্তর ময়মনসিংহের অন্যতম পত্রিকা। হাবিবুর রহমান শেখ-এর সম্পদনায় বাংলার দপর্ণ প্রকাশিত হতো। ১৯৮০ সালে তিনি দৈনিক জাহান প্রকাশ করেন। যার প্রথম থেকেই পরিচয়জ্ঞাপক বাক্য ছিল “কৃষি ভিত্তিক জাতীয় সংবাদপত্র”। এখন সে বাক্যটি থেকে কৃষি ভিত্তিক শব্দটি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। ‘দৈনিক জাহান’ বৃহত্তর ময়মনসিংহের সাংবাদিকতার পথিকৃত। এ কথাটি কারো কাছে বলতে ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়েনা।
বাংলার দপর্ণ থেকেই মূলত সাংবাদকর্মী হিসেবে আমার পরিচয় শুরু। বাংলার দপর্ণ বিভিন্ন গুরুত্বপুর্ণ স্থানে সংবাদকর্মী নিয়োগ করেছিল। এর হয়ত দু’টি কারণ ছিল। প্রথমত তৃণমূল থেকে সংবাদ উঠিয়ে নেয়া। দ্বিতীয়ত পত্রিকার প্রচার সংখ্যা বাড়ানো। সে সময় মিজানুর রহমান বাবু শ্যামগঞ্জ, মাহবুবুল আলম নবাব জারিয়া আর আমি পূর্বধলা সদর কেন্দ্রিক সংবাদকর্মী ছিলাম। অবশ্য আমার পূর্বে পূর্বধলা থেকে চন্দন শীল কিছু দিন বাংলার দপর্ণে কাজ করেছেন।
দৈনিক জাহান বেরোবার পর বাংলার দপর্ণ থেকে আমরাও জাহানের সাথে অঙ্গীভুত হয়ে গেলাম। বাংলার দপর্ণ থেকেই আমরা সম্পাদক হাবিবুর রহমান শেখের শিষ্যত্ব বরণ করে নিয়ে ছিলাম। সে সময় আমরা পত্রিকায় যা লিখে পাঠাতাম; আর যা ছাপা হতো; তার মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকতো। কখনো সংবাদের উপস্থাপন কৌশল, কখনো বাক্য গঠনের ত্রæটি মুক্ত করে ছাপা হয়ে বেরোতো। যদি কোন দিন কোন সংবাদ হাতে হাতে দিতাম, সে দিন আতঙ্কিত থাকতাম। চেষ্টা করতাম ব্যস্ততা দেখিয়ে অফিস থেকে সটকে পড়ার। পাঁছে ডাক পড়ে। তেমনি একদিন একটি সংবাদের কাগজ কী ভাবে যেন, সম্পাদকের টেবিলে চলে গেল। তৎক্ষণাৎ সম্পাদকের টেবিলে হাজির হওয়ার তলব। প্রবেশ মাত্রই ধমক। কী লিখেছ? নির্বোধের মত দাড়িয়ে ছিলাম। তিনি সংবাদটি সংশোধন করে হাতে দিয়ে বললেন – কোথায় কি ভুল করে ছিলে দেখো। দেখে মনে হলো, অনেক ভুলইতো করে ছিলাম। এভাবে আদর শাসনে হাবিবুর রহমান শেখ অনেক শিখেছেন আমাদের।
আমাদের আনাড়ি লিখা সংবাদগুলো পাঠোদ্ধার করে মুদ্রণ উপযোগী করতে দৈনিক জাহানের একটি শক্তিশালী টিম কাজ করতো। সে টিমের উলে­খযোগ্য সদস্য ছিলেন- ইমাম উদ্দিন মুক্তা, মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, সুরেশ কৈরী, প্রণব রাউত, কাজী ইয়াছিন, আতাউল করীম খোকন, এম.এস দোহা। সুরেশ দা ২০০১ সালে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। বাকীরা এখন সাংবাদিকতা জগতের প্রথিতযশা মানুষ। কাজী ভাই, প্রবণবদা, খোকন ভাইয়ের সঙ্গে ময়মনসিংহে মাঝে মধ্যে দেখা হয়। এম.এস দোহা মোহনগঞ্জ থেকে সাংবাদিকতা করেন। বুলবুল ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। প্রায়ই ফোনে কথা হয়। আমার বই পড়ে মতামত দেন। সম্প্রতি ঢাকায় সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে একই মঞ্চে বক্তৃতাও করেছি।
ইতিহাস, ঐতিহ্য অনুসন্ধানে আমি প্রথম অনুপ্রাণীত হয়েছিলাম দৈনিক জাহান থেকে। একদিন মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল জানিয়ে দিলেন আমাদের প্রত্যেককে স্ব-স্ব উপজেলার নামকরণ, ইতিহাস, ঐতিহ্য নিয়ে ছবিসহ ফিচার তৈরি করে পাঠাতে হবে। সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের ছবিসহ সাক্ষাৎকার। এ কথা শুনে সে দিন মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম। তিন ইঞ্চি সংবাদ লিখতে সারা শরীর পানি শূন্য হয়ে পড়ে। এবার কি হবে। বুলবুল ভাই অনেক কলা কৌশল বুঝিয়ে দিলেন। বাড়ি পৌঁছে তেমন কিছু মনে নেই। শুধু এইটুকু মনে আছে- আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাজ করুণ। নিজেকে অনুসন্ধানী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলোন। পরিকল্পনা করে লিখতে বসুন।
তাই চেষ্টা করে ছিলাম। সে সময়ে সেই ফিচার লিখা হয়ে ছিল, কি না তা আজও জানিনা। তবে ছাপা হয়েছিল সে কথা মনে আছে। তবে সে সময়ের কথাগুলো আমার জীবনে কাজে লেগেছিল। সে থেকে আমি অনেক সফলতা পেয়েছি। চেষ্টা করতে করতে ১৩টি গ্রন্থের প্রণেতা হয়েছি। সম্পাদনা করেছি একটি গ্রন্থ। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক সেমিনারে অনেক বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছি। নানা সংস্কৃতি নিয়ে জাতীয় ও অন্তর্জাতিক অনেক সেমিনারের মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলেছি।

তিন.
১৯৮৪ সালের শেষের দিকে মিজানুর রহমান বাবু লেখাপড়া করতে শ্যামগঞ্জ ত্যাগ করেন। তার স্থলে দৈনিক জাহান-এর শ্যামগঞ্জ সংবাদদাতা হিসেবে স্থলাভিষিক্ত হন গৌতম রায়। উচ্চ মাধ্যমিক ক্লাশের ছাত্র সে। এখানে বলে রাখি মফঃস্বল থেকে আমরা যারা সাংবাদিকতায় মগ্ন হয়ে ছিলাম, আমাদের অনেকেই কলেজ পড়–য়া ছাত্র ছিলাম। আবার কয়েক জন স্কুল, কলেজের শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংবাদিকতা করতেন। সে সময় আমিও কলেজ পড়–য়া ছাত্র। শখের বসে সাংবাদিকতা শুরু করি। ক্রমে সে শখের সঙ্গে সামাজিক দায়বোধ এসে যুক্ত হয়। সহজ কথায় সাংবাদিকতার চক্রাবর্তের ঝোঁকে আক্রান্ত ছিলাম। গৌতম রায়ের মাঝেও আমি সে সময় তা লক্ষ্য করেছিলাম। একই পত্রিকার লোক হিসেবে গৌতমের সঙ্গে আমার সম্পর্ক গড়ে ওঠে ছিল। প্রথম প্রথম গৌতম সপ্তাহে অন্তত একবার হলেও পূর্বধলায় আসতো । কারণে অকারণে চিঠি লিখতো। আমিও অনেক সময় কারণে অকারণে শ্যামগঞ্জ যেতাম। সে সময় গৌতমদের ধানের গদীতে পরিচয় হয়েছিল অধ্যাপক সুধীর দাস, অধ্যাপক জি.এম হায়দারের সঙ্গে। পিতৃতুল্য সে দু’ব্যক্তি সে সময় ময়মনসিংহ ও নেত্রকোণার সাংস্কৃতিক অঙ্গণের স্বনামধন্য মানুষ। মহুয়া পালার বয়াতি অধ্যাপক সুধীর দাসের সঙ্গে তাঁর জীবনের শেষ সময় পযর্ন্ত আমার নিবিড় সম্পর্ক ছিল। অধ্যাপক জি.এম হায়দারও আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু শ্যামগঞ্জের পথে হাটলে কখনো কখনো মনে হয় জি.এম হায়দার পেছন থেকে আমাকে ডাকছেন। আমার জীবনে অনেকবার এ Hallucination ঘটেছে।
সে সময় গৌতম দৈনিক জাহানের পাশাপাশি নব অভিযান, ভোরের কাগজের সঙ্গে যুক্ত হন। যতদুর মনে পড়ে ‘তিলোত্তমা’ নামে একটি সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনেও কাজ করতো গৌতম। আমিও সে সময় দৈনিক জাহানের পাশাপাশি দৈনিক খবর পত্রিকায় কাজ করি।

চার.
আমাদের সময় পূর্বধলায় সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আলী ওয়াহাব পাঠান। বড়দের কাছে কাঞ্চন মাস্টার। ছাত্রদের কাছে কাঞ্চন স্যার হিসেবে তিনি বেশি পরিচিত ছিলেন। তিনি আমারও সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। কাঞ্চন স্যার নেত্রকোণা শহরের মানুষ। খলিশাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে অংকের শিক্ষক হিসেবে তিনি প্রথম পূর্বধলায় আসেন। পরে পূর্বধলা জগৎমণি উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদেন। আমারা শিক্ষক হিসেবে কাঞ্চন স্যারকে সম্মান করতাম। তাকে বাড়তি সম্মান করতাম একজন সাংস্কৃতিমনা মানুষ হিসেবে। যে কোন সঙ্গীতানুষ্ঠানে সুযোগ পেলেই তিনি তবলা বাজাতেন। তাঁর এ গুণটি আমাকে বেশি আকৃষ্ট করেছিল।
কাঞ্চন স্যার ঢাকার দৈনিক কৃষাণ পত্রিকার পূর্বধলা সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করতেন। শিক্ষকতা করতে যেয়ে সাংবাদিকতায় তেমন সময় দিতে পারতেন না। দৈনিক কৃষাণ পত্রিকার পূর্বধলায় প্রচার ছিলনা, এটা ছিল কাঞ্চন স্যারের বড় দুঃখ।
১৯৮৫ সালে আমার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল দিপক সরকারের। পরিচয়ের মাধ্যম ছিলেন নেত্রকোণার ‘সাপ্তাহিক নেত্র’ পত্রিকার সম্পাদক হুমায়ূন কবীর সেলিম। দিপক সরকার সে সময় সেলিমের ‘নেত্র’ পত্রিকার পূর্বধলা সংবাদদাতা। একই সঙ্গে সে ঢাকার দৈনিক ‘বাংলার বাণী’ পত্রিকায়ও লিখতেন। দিপকের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল। এছাড়া সে তড়িৎ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। সে সকল কারণেই পরিচয়ের পর থেকে তাকে আড্ডার সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়ে ছিলাম। কাঞ্চন স্যারের সঙ্গে স্বাভাবিক কথাবার্তা হতো, কিন্তু আড্ডা হতোনা। এর কারণ ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ক। পূর্বধলার সাংবাদিকদের ঐক্যের কথা ভেবে দিপক আমাদের সকলের আড্ডার একটা পরিবেশ সৃস্টি করে ছিলেন।
১৯৮৬ সালে ‘আজকের বাংলাদেশ’ পত্রিকার পূর্বধলা সংবাদদাতা হিসেবে কাজ শুরু করেন আজিজুর রহমান চন্দন। চন্দন নামেই সে বেশি পরিচিত ছিলেন। আমি তাকে তার শৈশব থেকেই চিনতাম, জানতাম। পাশাপশি গ্রামে আমাদের অবস্থান। আমাদের মাঝে পারিবারিক সম্পর্কও অনেক পূর্ব থেকে। মেধাবী ছাত্র হিসেবে চন্দনের স্কুল জীবনে খুব নামডাক ছিল। বয়সের ব্যবধানে আমার সঙ্গে তার তেমন কথা হতোনা। সংবাদকর্মী হিসেবে চন্দনকে পাওয়ার পর কোন অদৃশ্য শক্তি আমাদের বয়স সমান করে দিয়েছিল। সে শক্তির উৎসের সন্ধান আজও আমি করতে পারিনি। বিচিত্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মানুষ চন্দন। কোন অর্থেই তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে নেতিবাচক দিকে চিন্তা করার সুযোগ নেই। তার মান-অভিমান একটু বেশি ছিল। মান-অভিমান ভাঙ্গানোও যেতো সহজে। সরি বল্লেই চন্দন রি-প্লেজ হয়ে যেতেন।
একই পত্রিকা দিয়ে কাজ শুরু করেন দেলোয়ার হোসেন তালুকদার। তার গ্রামের বাড়ি শ্যামগঞ্জ অঞ্চলের কাজলা গ্রামে। এক সময় শ্যামগঞ্জ কেন্দ্রিক তার চলাচল ছিল। গৌতম ছিলেন তার বন্ধু; সিদরাতুল ছিল গুরু। এক সময় পড়ালেখা করতে দেলোয়ার পূর্বধলায় অবস্থান নেন। পাশাপাশি সংবাদিকতার শুরু করেন। রৌশন মালেকের সঙ্গে তার সাংবাদিকতার সুবাদে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। রৌশন মালেকের‘শিল্প থেকে সাহিত্য’ সাময়িকীটির পরিচর্যায় এক সময় দেলোয়ার নিয়োজিত হয়ে ছিলেন। প্রকাশনাটি ছিল সৌদি বাংলা শিল্প প্রকল্পের। নানা কারণেই শিল্প থেকে সাহিত্য কে আমরা তেমন ভাল চোখে দেখতাম না।
আমি পূর্বধলা সদরে অবস্থান করতাম। আমাদের ওষুধের ব্যবসা ‘সততা ফার্মেসীর’ পেছনেই থাকতাম। আমার থাকার স্থানটি ছিল বেশ প্রশস্ত। আড্ডার জায়গা হিসেবে বেশ পরিচিত ছিল। দেশের অনেক নামী-দামী মানুষ এখানে অড্ডা দিয়ে গেছেন। পূর্বধলার অনেক ভাল কাজের পরিকল্পনা হয়েছিল সে ফার্মেসীর পেছনে। বলতে গেলে অত্রাঞ্চলের সাহিত্য, সাংস্কৃতিক চর্চার সূচনা হয়েছিল সততা ফার্মেসীর পেছনের আড্ডা থেকে।
ইতোমধ্যে দেলোয়ার সৌদি বাংলা শিল্প প্রকল্পের আঙ্গীনা ত্যাগ করে চলে এলেন আমার এখানে। আমার দু’টি বালিশের একটি তার দখলে নিয়ে গেলেন। ক্রমে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেল সে বালিশের দখলীয় সত্ত¡ তার। বরাবরই অধিকার প্রতিষ্ঠার কৌশল দেলোয়ারের ভাল জানা। এক পর্যায়ে দেলোয়ার আমার পারিবারিক আঙ্গীনা ঘুরে বেড়ানো অধিকার অর্জন করে নিলেন। ১৯৮৬ সালের বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে দেলোয়ার, দিপক, চন্দরসহ আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম একাট প্রকাশনা বের করার। সে প্রকাশনায় দেলোয়ারের অগ্রণী ভূমিকা ছিল। সে সময় আমাদের সঙ্গে অনেকেই যুক্ত হলেন। যারা যুক্ত হলেন তারা সকলেই সাহিত্য কর্মী। জুলফিকার আলী শাহীন তখন নিয়মিত ছড়া লিখতেন। সেও প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত হলেন। সে প্রকাশনার সঙ্গে প্রেসক্লাবের সকলেই্ জড়িত ছিলেন না।
প্রকাশনার নামকরণ নিয়ে আমরা খুব ভাবতে লাগলাম। সে সময় আমাদের সহায়তা করলেন আবদুল ওয়াদুদ খান। তিনিই আমাদের বললেন নেত্রকোণা থেকে ‘উত্তর আকাশ’ নামে একটি প্রকাশনা বের হতো। ১৯৬২ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তার প্রকাশনা অব্যাহত ছিল। তোমরা ইচ্ছে করলে সে নামটি ব্যবহার করতে পার। তবে অবশ্যই যেন উত্তর আকাশের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক খালেকদাদ চৌধুরীর নামটি সামনে রাখা হয়। আমরা সম্মতি দিলাম। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদকের নাম আমরা উত্তর আকাশের প্রতিটি সংখ্যায় সম্মান জনক ভাবেই ছাপাতাম। আবদুল ওয়াদুদ খান ছিলেন সংস্কৃতিমান মানুষ। তিনি ছিলেন ময়মনাসিংহের ‘নির্মাতা ফার্নিচার মার্ট’ এর মালিক। ময়মনসিংহের ইফ্ফাত আরা-র ‘দেশ মুদ্রণ’ থেকে ‘উত্তর আকাশ’ ছাপা হলো। সে প্রকাশনাটি আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি চর্চায় যথেষ্ট অনুপ্রাণীত করেছিল।

পাঁচ.
১৯৮৬ সালের সম্ভবত এপ্রিল মাসে এইচ.এস.সি পরীক্ষার্থীরা পূর্বধলা সদরে আসতে শুরু করলো। গৌতম শ্যামগঞ্জ হাফেজ জিয়াউর রহমান কলেজ থেকে পরীক্ষার্থী। সে কলেজের পরিক্ষা কেন্দ্র পূর্বধলা ডিগ্রী কলেজে। গৌতম বইপত্র নিয়ে পূর্বধলায় চলে এলেন। সে থাকার জায়গা করে নিয়ে ছিলেন পূর্বধলা সদরের বিমল সাহা-র বাসায়। সময় পেলেই আমাদের সঙ্গে আড্ডার জন্য সততা ফার্মেসীতে চলে আসতেন। সে সময় আমরা সকলেই পূর্বধলার সাংবাদিকদের ঐক্যের কথা ভাবতাম। একটি প্রেসক্লাব গঠনের কথা আলোচনা করতাম। মনে মনে শঙ্কা কাজ করতো রাজনৈতিক নেতাদের আচার নিষ্ঠা দেখে। সাংবাদিকদের ঐক্য দেখে যদি রাজনৈতিক নেতারা রাজনৈতিক খেলা শুরু করে দেয়। অবশ্য পরে তাই ঘটেছিল। রাজনৈতিক নেতাদের পোষ্য চোরেরা প্রেসক্লাবের চেয়ারগুলো চুরি করে নিয়ে ছিল।
পরিক্ষার ফাঁকে গৌতম শ্যামগঞ্জ যাচ্ছেন। ব্যক্তিগত কাজে পরদিন সে ময়মনসিংহেও যাবেন। আমরা তাকে ময়মনসিংহের ‘আজকের বাংলাদেশ’ পত্রিকায় প্রেসক্লাব গঠনের সভা আহŸান করে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আসতে বলেদেই। যথারীতি সে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আসেন। পত্রিকায় ছাপাও হয়। কিন্তু আমরা লোকজনের অনুপস্থিতির কারণে সভা করতে পরিনি। এর পরও আমরা হাল ছাড়িনি। আমি দায়িত্ব নিলাম পূর্বধলা ও গৌতমকে দায়িত্ব দেয়া হলো শ্যামগঞ্জ, হিরণপুর কেন্দ্রিক সাংবাদিকদের পুর্ণনির্ধারিত তারিখে হাজির করাতে। আবারো আজকের বাংলাদেশ পত্রিকায় সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হলো। আবারো আমরা ব্যার্থ । আর ঘটা করে কোন আয়োজনের কথা না ভেবে ব্যক্তি কেন্দ্রিক আমরা যোগাযোগ শুরু করলাম। হিরণপুরের তারা মিয়া ও মোজাহিদুল ইসলাম সবুজ, শ্যামগঞ্জের অমল দাস, রুহুল আমীন, এমদাদুল ইসলাম, কাজল দাস এর সঙ্গে গৌতম সরাসরি যোগাযোগ করলেন। দিপক, দেলোয়ার সহ আমরা যারা পূর্বধলায় বসবাস করি আমরা নির্ধারিত তারিখটির জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম । সে বার সভা হলো। কিন্তু আমি হতাশ। এত চেষ্ঠার পর এক সভা। পরে কি হবে। দিপক, চন্দন, দেলোয়ার ও গৌতমদের কথাগুলো মাঝে মাঝে আমার মাঝে আশার সঞ্চার করেছিল।

ছয়.
ইতোমধ্যে আমরা প্রেসক্লাব কার্যালয়ের জন্য ভাবতে আরম্ভ করলাম। আমাদের নজরে পড়লো স্বাস্থ্য বিভাগের পুরনো টিনের ঘরটি। যা জামতলা বাজারের পশ্চিম পাশে। ১৯৭৫ সালে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের পর টিনের ঘরটি পরিতক্ত হয়ে পড়ে। অবশ্য স্বাস্থ্য বিভাগ টিনের ঘরটি তাদের হাত ছাড়া করেনি। ঘরের বেড়ায় স্যানেটারী ইন্সপেক্টরের একটি সাইনবোর্ড ঝুিলয়ে দখল রেখেছে। দু’জন স্বাস্থ্যকর্মীও সে ঘরে থাকেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: বজলুর রহমান। সে সময় আমাকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওষুধ সংক্রান্ত অনিয়মের উপর একটি রিপোর্ট করতে হলো। রিপোর্টটি খবর পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। ডা: বজলুর রহমান রিপোর্টের কোন প্রতিবাদ করলেন না। হয়ত প্রতিবাদ করে বিষয়টি আবারো তিনি সামনে আনতে চান নি। অবশ্য এ কথাটি পরে তিনি আমাদের কাছে স্বীকারও করে ছিলেন। এর মধ্যেই একদিন ডা: বজলুর রহমান সাহেব আমাদের ডেকে কথা বলতে চাইলেন। রিপোর্ট যা হবার আমরা তাই করেছি। এখন কি কথা বলতে চান? আমরা কথা শুনতে গেলাম। তেমন কোন কথা হয়নি। শুধু খাতির যতœ। আমরাও সুযোগ নিলাম স্বাস্থ্য বিভাগের পরিতক্ত টিনের ঘরটি প্রেসক্লাবের জন্য…। তিনি দিতে রাজী হলেন, কিন্তু এও বলে দিলেন যদি উপর থেকে চাপ আসে তবে তার কিছু করার থাকবেনা। আমারা সে অবস্থাতেই রাতারাতি একটি সাইনবোর্ড লিখে টানিয়ে দিলাম। আপাতত পূর্বধলা প্রেসক্লাবের কার্যালয় হলো। আমাদের বড় পাওয়ার একটি পুরণ হলো।
ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিকে আমরা পুর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের তারিখ নির্ধারণ করলাম। সে তারিখটি মনে করতে পারছিনা। তবে এটুকু মনে আছে প্রেসক্লাবে কোন চেয়ার-টেবিল না থাকায় সততা ফার্মেসীতেই আমরা বসছিলাম। সভা শুরু হওয়ার আগেই আমাদের মাঝে মৃদু আলোচনা চলছিল, কাকে কোন পদ দেয়া যায়। আলোচনায় উঠে আসে আমাকে সভাপতি, গৌতম কে সাধারণ সম্পাদক করার। অনেকে সে প্রাস্থাবটি প্রত্যাখ্যান না করে পাশাশাশি প্রস্থাব করেন কাঞ্চন স্যারকে সভাপতি আমাকে সাধারণ সম্পাদক করলে কেমন হয়। এ নিয়ে আমাদের মধ্যে স্নায়ূযুদ্ধ চলছিল। এর মধ্যেই আনুষ্ঠানিক সভা শুরু হয়ে যায়। সাধারণ আলোচনার পর কমিটি গঠনের পালা। গৌতম প্রস্থাব করেছিল কাঞ্চন স্যার কে সভপতি করতে। আমরা সে প্রস্থাব সমর্থন করে পাশ করে নিলাম। দ্বিতীয় প্রস্থাব হওয়ার কথা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচনের উপর। কাঞ্চন স্যার প্রাস্থাব করলেন আমাকে সহ সভাপতি নির্বাচনের। গৌতম সে প্রস্থাব সমর্থন করে। অন্যদের মাঝ থেকেও সমর্থন আসে। তবে দিপক তাতে সমর্থন না করে আমাকে সাধারণ সম্পাদকের জন্য প্রস্থাব আনে। এ নিয়ে উপস্থিত সদস্যদের মাঝে পরস্পর আলোচনা চলে বেশ কিছু সময়। পরে অবশ্য সকলেই একমত হয়। আমি সহ সভাপতি। সাধারণ সম্পাদক পদে গৌতমকে মনোনীত করতে কাঞ্চন স্যার প্রস্থাব করলেন। আমরা সকলেই মেনে নিলাম। কোষাধ্যক্ষ করা হলো দিপক কে। সাংগঠনিক সম্পাদক করা হলো দেলোয়ার কে। অন্যান্য কোন পদে কে ছিলেন সে কথা আজ আর মনে নেই। অবশ্য প্রথম সদস্য করা হয়েছিল পূর্বধলা ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক আবুল হাসিম সরকার কে। সে দিন সর্বমোট ১৩ সদস্য বিশিষ্ট্য কমিটি গঠিত হয়েছিল। অবশ্য পরের সপ্তাহে আরো দু’জন সদস্য নেয়া হয়েছিল। তারা হলেন ইসমাঈল হোসেন খোকন ও মজিবুর রহমান খান। তাদের নিয়ে ক্লাবের সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়ে ছিল ১৫ জনে।
জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে ক্লাবের সভায় সিদ্ধান্ত হলো নতুন কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠান হবে। নেত্রকোণা জেলার জেলা প্রশাসক জনাব এম.এন নবী প্রধান অতিথি। বিশেষ হিসেবে অতিথি হিসেবে দৈনিক জাহান পত্রিকার সম্পাদক হাবিবুর রহমান শেখ কে আমন্ত্রণ করা হবে। অতিথিদের সঙ্গে কথা বলে তারিখ নির্ধারণ করা হলো ২০ জানুয়ারি (১৯৮৭)। আমাদের অভিষেক অনুষ্ঠানের জন্য পূর্বধলার সকল শ্রেণির মানুষ এগিয়ে আসেন। বিশেষ করে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবদুল আজিজ, আমাদের অনেক সহায়তা করে ছিলেন। সেই আবদুল আজিজ সাহেব পরে সরকারের মন্ত্রী পরিষদ সচিব পর্যন্ত হয়েছিলেন।
অভিষেকের দিন আমাদের মাঝে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছিল। ময়মনসিংহ প্রেসক্লাব থেকে ১‘শ প্যাকেট বিরিয়ানি আনা হলো। সন্ধ্যার পরপর অভিষেক অনুষ্ঠান শুরু হলো। জেলা প্রশাসক এম.এন নবী. দৈনিক জাহান সম্পাদক হাবিবুর রহমান শেখ সহ নেত্রকোণা, ময়মনসিংহ থেকে আসা সাংবাদিকরা বক্তৃতা করলেন। আমাদের অভিষিক্ত করা হলো। ক্লাবের চেয়ার, টেবিল ক্রয়ের জন্য জেলা প্রশাসক সাহেব ৫ হাজার টাকা অনুদান ঘোষণা করলেন। সে দিন আমরা আমাদের দীর্ঘ দিনের শ্রমের সাফল্য অর্জনের তৃপ্তি অনুভব করলাম। সে অনুষ্ঠানটি পূর্বধলার শিক্ষিত সমাজে জাগরণ তোলতে পেরেছিল।
জেলা প্রশাসকের অনুদানের টাকা হাতে পেয়ে চেয়ার টেবিল ক্রয়ের জন্য আমরা ময়মনসিংহে যোগাযোগ করলাম। নির্মাতা ফার্ণিচার মার্টের মালিক আবদুল ওয়াদুদ খান ১০টি চেয়ার ও ১টি টেবিলের বাজার মূল্য ৬ হাজার টাকার স্থলে সাড়ে চার হাজার টাকায় আমাদের দিয়ে দিলেন। সে চেয়ার, টেবিল ট্রেনে, পরে আমরা মাথায় করে ক্লাবে পৌঁছালাম। সে দিন আমাদের মাঝে কি আনন্দ সে কথা ভাষায় প্রকাশ করা যাবেনা।
পূর্বধলা প্রেসক্লাবের কার্যক্রম দেখে পূর্বধলার সচেতন মহল তথা সাংস্কৃতিক অঙ্গণে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। পূর্বধলাকে জাতীয় ভাবে তুলে ধরার প্রচেষ্টার কেন্দ্র হিসেবে প্রেসক্লাবের যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছিল। সে সময় সংবাদের তথ্য সন্ধানে আমরা বন্যার কত জলের উপর দিয়ে ঘুরেছি। ক্ষরার কত রোদ আমরা মাথায় নিয়ে ছুটেছি। ক্লান্তি শব্দটির সঙ্গে আমাদের তখন পরিচয় ছিলনা। প্রতিদিন পূর্বধলার কোন না কোন সংবাদ পত্রিকাতে থাকতোই। সরকারের উচ্চ কোন কর্মকর্তা পূর্বধলায় আসলে প্রেসক্লাবের খোঁজ নিতো। এরশাদ সরকারের কৃষি প্রতিমন্ত্রী আবদুস সালাম প্রেসক্লাবে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে গেছেন। সেখানে তিনি কথা প্রসঙ্গে বললেন পূর্বধলার সংবাদ নিয়মিত বিভিন্ন পত্রিকায় বেরোয় তা তিনি লক্ষ্য করেছেন। সুতরাং এখানকার সাংবাদিকরা বেশ তৎপর। হাসতে হাসতে তিনি বলে ছিলেন- ‘কে কোন রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী তা আমার জানার প্রয়োজন নেই। তবে আমাদের সরকারকে আপনারা সহায়তা করবেন, সে বিশ্বাস আমার আছে। কেননা আমি আপনাদের মানুষ। আমি এক সময় গেীরীপুর কলেজে শিক্ষতা করেছি। আমার বাড়ি, আপনাদের বাড়ির পাশেই। ওই নালিতাবাড়ি।’ সে দিনের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাথে ছাত্র সমাজ তথা স্থানীয় এমপির চাটুকারেরা মারামারি-র সংবাদ সহ তার ব্যক্তি সহায়তা চাওয়ার সংবাদটি ‘খবর’ সহ বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল । পরে বিএনপির শাসনামলে প্রাক্তন ওই প্রতিমন্ত্রী সঙ্গে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। তিনি আমাকে দেখেই চিনতে পেরেছিলেন। সেদিন তিনি বলেছিলেন – ‘ইতিবাচক শব্দ দিয়েও যে নেতিবাচক বুঝানো যায়।’ আমি আপনাদের সংবাদ প্রকাশের পরের সপ্তাহে তা হড়েহাড়ে টের পেয়েছিলাম।’
পূর্বধলা প্রেসক্লাব তার আদর্শ উদ্দেশ্য নিয়ে এগোতে থাকলো। একটি ঈর্ষাকাতর মহল এ বিষয়টি ভাল ভাবে নেয় নি। চুরি হয়ে গেল পূর্বধলা প্রেসক্লাবের চেয়ারগুলো। শুধু পড়ে রইল টেবিলটি। সে ঘর, জায়গা এখন আর প্রেসক্লাবের দখলে নেই। স্বাস্থ্য বিভাগের দখলেও নেই। ব্যক্তি সম্পদ দাবি করে একটি মহল তাদের করে নিয়েছে।
আজকের পূর্বধালায় দাঁড়িয়ে সে সময়ের পূর্বধলা দেখা কষ্টকল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। পূর্বধলা প্রেসক্লাবের সে সময়ের অনেক সদস্য জীবিকার প্রয়োজনে নানা পেশায় চলে গেছেন। গৌতম পুলিশ বিভাগে চাকরী নিয়েছিলেন। দিপক স্বাস্থ্য বিভাগে চাকরী নিয়ে চলে গেছেন। চন্দন বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত। অমল রাজস্ব বিভাগে চাকরী করছেন। এমদাদ শিক্ষকতা করতেন। অনেক পরে জেনেছি সে আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছেন। কাজল দাস শিক্ষকতায় নিমগ্ন হয়েছেন। রুহুল-আমীন শ্যামগঞ্জ মোড়ে ব্যবসা করেতেন। এখন কোথায় জানিনা। তারা মিয়া এখন কি করেন তার খবরও রাখতে পারিনা। মজিবুর ঢাকায় থাকেন। দেলোয়ার সাংবাদিকতা করতেন। ঢাকায় দৈনিক দিনকাল পত্রিকার অফিসে কর্মরত ছিলেন। পরে চাকরি ছেড়ে প্রকাশনা ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। সবুজ নেত্রকোণার একটি পত্রিকা অফিসে কাজ করেন। খোকন এখনো পূর্বধলায় থেকে সাংবাদিকতা চালিয়ে যাচ্ছেন। কাঞ্চন স্যার, ২০১৭ সালের ২৮ জুলাই আমাদের মাঝ থেকে চলে গেছেন। হাসিম স্যারও পরলোক গমণ করেছেন ২০১২ সালের ২০ নভেম্বর। আমাদের ছেড়ে চলে তাঁরা গেলেও অনেক স্মৃতি রেখে গেছেন। আমি পত্রিকা ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু লেখালেখি ছাড়িনি। লেখালেখি আমি আমার জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহন করেছি।

সাত.
২০১০ সালের ১৯ এপ্রিল পূর্বধলা প্রেসক্লাবের প্রথম সাধারণ সম্পাদক গৌতম কুমার রায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে পুরান ঢাকায় নিহত হয়েছেন। সকালে অধ্যাপক সুধীর দাসের ছেলে সুদীপ্ত দাস সে দুঃসংবাদটি আমাকে দেয়ার পর থেকে আমি বিধুরতার রাজ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলে ছিলাম। কোথায় যেন সব ফাঁকাফাঁকা বলে মনে হচ্ছিল। নিজেকে হালকা করতে দিপকের সঙ্গে এ বিষয়ে টেলিফোনে কথা বললাম। চন্দন তাঁর খুলনার অফিস থেকে আমার সঙ্গে কথা বলে হালকা হতে চেষ্টা করলেন। এর পরও কি আমরা কেউই দুঃখবোধ ভুলে হালকা হতে পেরেছিলাম? বিকেলে গৌতমের লাশ দেখে নিজেকে ধরে রাখতে খুব কষ্ট হয়ে ছিল। জীবনের খাতায় যোগের চেয়ে বিয়োগ অংক ক্রমেই বেশি হয়ে যাচ্ছে। অতীত স্মৃতিগুলো কেবলই ভেসে আসে, আসল রং হারিয়ে, ধূসর বর্ণের হয়ে।
(লেখাটি অসমাপ্ত। গৌতম রায়ের মৃত্যুর পরপরই লেখাটি শুরু করা; পরে কিছু তথ্য যুক্ত করে দেয়া হয়েছে। এ লেখায় আবেগ বেশ সক্রিয় ছিল। সে কারণে কিছু বিষয় গৌণ হয়ে গেছে বলে অনেকের মনে করা স্বাভাবিক)।

আলী আহাম্মদ খান আইয়োব : লেখক, গবেষক ।


মতামত

লেখাটি এক কথায় চমৎকার। পড়তে গিয়ে আমি যেন অতীত স্মৃতি রোমন্থনে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমার মনে তখন ঐ সময়ের সহস্র ঘটনা ঘিরে রেখেছে। টুকরো টুকরো আনন্দ, বেদনা, ঘটনা, দুর্ঘটনা গুলো শুধুই মনে পরছিল।আমাদের চাওয়া, কিছু টা না পাওয়া, খানিক পাওয়ার সুখস্মৃতি নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা, বিরহ বিচ্ছেদ, মান অভিমান সবই যেন আয়নার মতো ভেসে উঠেছে এই লেখায়। মন উজাড় করে, নিজের ব্যক্তিগত জীবনের কথা চিন্তা না করে আমরা পূর্বধলার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সবসময় চিন্তা করতাম। তৎকালীন ত্রিধারা রাজনীতির বাইরে আমাদের একটি নিরপেক্ষ বলয় তৈরি হয়েছিল যা সর্বজন গ্রাহ্যতা পেয়েছিল। জীবন জীবীকার প্রয়োজনে আমরা আজ একেকজন একেক স্থানে। কেউবা পরপারে। নতুন প্রজন্ম পূর্বধলার সাংবাদিকতায় আশানুরুপ ফল দিতে পারেনি। প্রেস ক্লাবের সেই জৌলুশ ও আর নেই।

যা হোক অনেক দিন পরে হলেও প্রেস ক্লাব সৃষ্টির প্রকৃত ইতিহাস টি আপনি প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন, এজন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আর লেখাটি পূর্বধলার দর্পণে ছাপানোয় কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ। এমন সৃজনশীল লেখা আরো ছাপা হোক এই কামনা করি।

মহামারি

এ ধারায় সবই আজ মাখা-মাখি করে কেবলই মানবকূল ভয়ে থরথরে।…